শ্রী শ্রী ঠাকুরের চোখে - বিকাশের দর্শন, জীবনের আন্দোলন (পর্ব ২)
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবার, কর্ম ও সামাজিক দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়ে পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার পথ
একটা অদ্ভুত সত্য আছে চিকিৎসাশাস্ত্রে — সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থা সেটা নয় যেখানে রোগ ধরা পড়েছে । সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থা সেটা, যেখানে রোগ ধরা পড়েনি , অথচ চিকিৎসা চলছে । কাল্পনিক রোগ নির্ণয়ের উপর ভিত্তি করে ওষুধ দেওয়া হচ্ছে — আর রোগী ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে । এই কথাটা শুধু শরীরের ক্ষেত্রে সত্য নয়। সমাজের ক্ষেত্রেও সত্য। জাতির ক্ষেত্রেও সত্য।
আজ দেশ জুড়ে অভাবের কশাঘাত। এই অভাব নিয়ে কথা কম হয়নি । সমাধান নিয়ে বক্তৃতার অভাব নেই। কিন্তু অভাব কমেনি — বরং বেড়েছে । কেন? কারণ রোগটা ঠিকমতো চেনা হয়নি । চিকিৎসা চলছে — কিন্তু ভুল রোগের।
আমরা বলছি ভারতের আধ্যাত্মিকতার কথা, বিশ্বসভ্যতার জননীর কথা। গৌরবের কথা বলতে কুণ্ঠা নেই। কিন্তু সেই গৌরবের ভেতরে কী ছিল — প্রাচীন ঋষিরা কীভাবে ভেবেছিলেন, কীভাবে সমাজকে গড়ে ছিলেন, কীভাবে সাময়িক অনাচারকে সরিয়ে শান্তি ফিরিয়ে এনেছিলেন — সেটা নিয়ে ভাবছি না।
একদিকে নিজের শিকড়ে অবিশ্বাস, অন্যদিকে পশ্চিমের দিকে ছুটে চলা। পাশ্চাত্য সভ্যতাকে আমরা অনসুরণ করতে চেয়েছি — কিন্তু সেটাকে সম্যকভাবে বুঝিনি , গ্রহণ করিনি । অপরিণত গ্রহণের ফলে হয়ে পড়েছি দিশেহারা। না ঘরের, না ঘাটের।
এই দিশেহারা অবস্থায় প্রতিনিয়ত ওষুধ বদলাচ্ছি । নতুন তত্ত্ব আসছে , পুরোনো তত্ত্ব যাচ্ছে । কিন্তু যে জীবনীশক্তি একটু ছিল, সেটাও ক্ষয় পাচ্ছে । শরীর দুর্বল হলে মনও দুর্বল হয় — এ কথা সবাই জানে । আর মন দুর্বল হলে মানুষ শক্তিমানকেও অবজ্ঞা করে । আদর্শের প্রতি নিষ্ঠা চরিত্র থেকে দূরে সরে যায়।
ফলে কী হয়েছে ? স্বাস্থ্য গেছে । সমাজবন্ধন নষ্ট হয়েছে । পারিবারিক শান্তি বিঘ্নিত হয়েছে । শিক্ষা, শিল্প, বাণিজ্য — যাকিছু জীবন ও বৃদ্ধির সহায়ক ছিল, সব টলমল করছে । এই অবস্থায় ধর্মশাস্ত্র, ঋষি, গুরু — এই শব্দগুলো শুনলেই রাগ হয়। মানুষ বলে, "রেখে দাও তোমার ধর্ম।"
এই রাগ অস্বাভাবিক নয়। কারণ ধর্মের নামে, শাস্ত্রের নামে অনেক অনাচার হয়েছে । অনেকে শাস্ত্রের কথা বলেন, কিন্তু আসলে মানেন দেশাচার আর লোকাচার। সেটাকেই শাস্ত্র বলে চালিয়ে দেন। কিন্তু রাগের বশে সব ছুঁড়ে ফেললে কি সমস্যার সমাধান হয়? যে শিশু গরম দুধে মুখ পুড়িয়েছে , সে কি দুধ খাওয়া ছেড়ে দেয়? ছেড়ে দিলে কি তার ভালো হয়?
পুরোনোকে অন্ধভাবে আঁকড়ে ধরা যেমন ভুল, নতুনের নামে পুরোনোকে সম্পূর্ণ ত্যাগ করাও তেমনই ভুল। যে জাতি নিজের প্রয়োজনে পরিবর্তন করতে পারে না, সে জাতির মৃত্যু অবধারিত। আবার যে জাতি শিকড় কেটে ফেলে —তারও।
পথ একটাই। যা সত্য, তাকে চিনতে হবে । সত্যের আবরণে মোড়া মিথ্যাকে বর্জন করতে হবে । এবং সেই সত্যকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যেতে হবে ।
পরের পর্বে সেই সত্যের ভি ত্তি গুলো — ধর্ম কী, শাস্ত্র কী, ঋষি কে , গুরু কে — এই কথাগুলো নি য়ে আলোচনা করব। কারণ শব্দগুলো না বুঝলে পথ খোঁজা কঠিন।
(ক্রমশঃ)


