শ্রী শ্রী ঠাকুরের চোখে - বিকাশের দর্শন, জীবনের আন্দোলন (পর্ব ৩)
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবার, কর্ম ও সামাজিক দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়ে পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার পথ
কিছু শব্দ আছে যেগুলো এত বেশি ব্যবহার হয়েছে , এত বেশি অপব্যবহার হয়েছে — যে শব্দগুলোর মানেই হারিয়ে গেছে । ধর্ম, শাস্ত্র, ঋষি , গুরু, ভগবান — এই শব্দগুলো শুনলে মানুষের মনে কী ভেসে ওঠে ? প্রায়ই ভেসে ওঠে ভ্রান্ত একটা ছবি ।
শ্রীশ্রীঠাকুর এই শব্দগুলোকে নতুন করে বুঝিয়েছেন — বরং বলা ভালো, সঠিকভাবে বুঝিয়েছেন।
ধর্ম বলতে আমরা সাধারণত বুঝি কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের বিশ্বাস, আচার, উপাসনা পদ্ধতি । কিন্তু এ ধারণা সম্পূর্ণ নয়। ধর্ম মানে — যার দ্বারা মানুষের বেঁচে থাকা ও বৃদ্ধি পাওয়ার প্রক্রিয়া অটুট থাকে । যা করলে আমরা আমাদের পারিপার্শ্বিক জীবনের সাথে একাত্ম হয়ে উন্নতির পথে চলতে পারি — সেটাই ধর্ম। আর যা এই প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে — সেটাই অধর্ম। সেটাই পাপ।
ধর্মের কেন্দ্রে আছে বাঁচা ও বাড়া — এর বাইরে কিছু নেই।
শাস্ত্র বলতে আমরা ভাবি পুরোনো সংস্কৃত গ্রন্থ, জটিল বিধিনিষেধের সংকলন। কিন্তু শাস্ত্র আসলে কী? শাস্ত্র হলো ঋষির মন্ত্রদর্শন। যে গভীর অনভুবের মধ্যে দিয়ে কোনো সত্যদ্রষ্টা সত্যকে উপলব্ধি করেন, এবং সেই উপলব্ধি কে ভাষায় প্রকাশ করেন — সেটাই শাস্ত্র। শাস্ত্র কোনো একটি জাতির জন্য নয়, একটি সম্প্রদায়ের জন্য নয়। যা চিরসত্য, যা শাশ্বত — তাই শাস্ত্র। ঋষিরা কখনো এমন কিছু বলেননি যা মানুষের অকল্যাণ করে । যারা ঋষির সত্যকে নিজের স্বার্থে বিকৃত করে প্রচার করে — সেটা শাস্ত্র নয়, সেটা প্রতারণা।
ঋষি বলতে আমাদের মনে ভাসে দীর্ঘ চুলদাড়ি , গৈরিক বসন, জঙ্গলে বসে ধ্যান। কিন্তু এ ধারণা ভ্রান্ত। প্রকৃত ঋষি হলেন তিনি , যিনি সত্যকে সম্যকভাবে দর্শন করেছেন এবং সেই দর্শনে মনের নিবৃত্তি লাভ করেছেন। ঋষিরা সমাজ বিচ্ছিন্ন ছিলেন না — তাঁরা ছিলেন সমাজের প্রাণকেন্দ্র। আর ঋষির আগমন কোনো কালে বন্ধ হয়নি — এ দেশে , অন্য দেশেও।
ভগবান মানে কোনো রহস্যময় সত্তা নন। ভগবান হলেন তিনি , যাঁর মধ্যে জগতের সমস্ত ঐশ্বর্য, জ্ঞান, প্রেম ও কর্ম সহজভাবে প্রবাহিত হয়। যাঁর প্রতি আসক্তি তে মানুষের বিচ্ছিন্ন জীবনের সমস্ত দ্বন্দ্বের সমাধান হয়।
গুরু হলেন সেই মূর্ত আদর্শ, যিনি সময় ও সীমাকে ছাপিয়ে ভগবানকে ধারণ করেছেন। যাঁর কাব্য, দর্শন ও বিজ্ঞান মনের ভালোমন্দ বিচ্ছিন্ন সংস্কারগুলি ভেদ করে আদর্শে সার্থক হয়ে উঠেছে ।
আর সমাজ হলো সেই সমষ্টি — যেখানে বহু মানুষ তাদের সকল বৈচিত্র্যকে একে অপরের কল্যাণে নিয়োজিত করে সাফল্যের দিকে অগ্রসর হয়।
এই সংজ্ঞাগুলো মাথায় রাখলে অনেক জট খুলে যায়। ধর্ম আর ভয়ের বিষয় থাকে না — ধর্ম হয়ে ওঠে জীবনের পথ।
শাস্ত্র আর বোঝা মনে হয় না — শাস্ত্র হয়ে ওঠে আলোর উৎস। গুরু আর দূরের কেউ থাকেন না — গুরু হয়ে ওঠেন জীবনের আশ্রয়।
শাস্ত্র আর বোঝা মনে হয় না — শাস্ত্র হয়ে ওঠে আলোর উৎস। গুরু আর দূরের কেউ থাকেন না — গুরু হয়ে ওঠেন জীবনের আশ্রয়।
এই বোঝাপড়ার উপর দাঁড়িয়েই এগিয়ে যাব আমরা। পরের পর্ব থেকে শুরু হবে সেই আলোচনা — যেটা সবচেয়ে জরুরি, সবচেয়ে ব্যক্তিগত। স্বাস্থ্য।
(ক্রমশঃ)


